
নিউজ ডেস্ক।।
বরিশালের বাকেরগঞ্জ থানায় সদ্য যোগদান করা ওসি (তদন্ত) আব্দুস সালামের এক সাংবাদিকের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের এক অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়েছে, যেখানে তিনি সাংবাদিক সমাজকে নিয়ে চরম অশালীন, কুরুচিপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। ফাঁস হওয়া ওই অডিওতে শুধু সাংবাদিকদেরই নয়, নিজের পুলিশ বাহিনীর সহকর্মীদের সম্পর্কেও আপত্তিকর মন্তব্য করতে শোনা যায়। এতে তিনি অতীতে ঘুষের টাকা ফেরত, ভিডিও দেখিয়ে তার কাছ থেকে সাংবাদিকের টাকা আদায় এবং প্রমোশনের জন্য সিনিয়র অফিসার কে টাকা দেওয়া সম্পর্কেও বিস্ফোরক স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ফাঁস হওয়া অডিওতে আব্দুস সালাম দাবি করেন, তার জীবনে আর্থিক ক্ষতির জন্য সাংবাদিকরাই দায়ী। তিনি অভিযোগ করেন, একসময় একটি ভিডিও ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক সাংবাদিক তার কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন এবং পরে তিনি বাধ্য হয়ে ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার মধ্যে সাংবাদিকদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি একটি অটোগাড়ি চুরির মামলার আসামিদের আদালতে হাজির করানোর প্রসঙ্গ তুলে ধরেন এবং পরবর্তীতে এক আসামি জেল থেকে বের হয়ে তার কাছে টাকা দাবি করে মামলা করার হুমকি দেয় বলে উল্লেখ করেন। তার হুমকির কারণে টাকা ফেরত দিতেও বাধ্য হয়েছেন তিনি। পাশাপাশি তিনি স্বীকার করেন, পদোন্নতি (প্রমোশন) সংক্রান্ত জটিলতা কাটাতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে নগদ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তিনি নিজেই বলেন, পুলিশের ভেতরেও অর্থ লেনদেনের ঘটনা রয়েছে এবং এ প্রক্রিয়ায় তিনি প্রায় ৫ লাখ টাকা হারিয়েছেন। বরিশালের স্থানীয় আঞ্চলিক দৈনিক আমাদের বরিশাল পত্রিকার যুগ্ম বার্তা সম্পাদক আহমেদ বায়েজিদের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের ফাঁস হওয়া একটি অডিওতে শোনা যায় “সাংবাদিক হোনলেই কলিজায় পানি থাকে না, আমার জীবনে যত ক্ষতি করছে সব সাংবাদিক, জীবনে অনেক টাকার ক্ষতি করছে আমার। আইয়াই ছবি তোলবে। আ’লীগের আমলে অটোগাড়ি চোরার মামলা দিছে অন্য পুলিশ। আমি মামলার বাকি আসামিদের আদালতে হাজির করাইয়া দিছি। ইমারজেন্সি সরকার যখন পল্টি মারছে তখন আসামি ফোন দিছে স্যার আমার টাহা দেন। আমি বলছি, কির টাহা দিমু ভাই? তখন সে বলে, ‘আমি ঈদ করতে পারি নাই, আমার টাহা দেন, নাইলে আমি মামলা করমু।’ পরে এক সাংবাদিক আমাকে বলে ‘ভাই আপনার একটা ভিডিও আছে, টাহা দেন ৫০ হাজার।’ পরে আমি ২০ হাজার টাহা দিয়ে দিছি। এ জন্য আমি সাংবাদিকের গুষ্টি… দি/, আমি ওই টাকা আদায় করমু। এ কারণে আমি সাংবাদিক দেখতে পারি না, ওগো দেখলেই আমার গায় জ্বালা ধরে। আরেকটা মামলার বাদী সার্কেলের সাথে কথা বলছে, যে কারণে আমার প্রমোশন আটকে ছিল। আমি স্যারকে বলেছি স্যার আপনার কত লাগবে কন, টাস করে আমি তারে ৫০ হাজার টাকার বান্ডিল দিয়ে দিছি। পুলিশ পুলিশেরে হো… মারে/, ৫ লাখ টাকা খুইয়াছি আমি। এ জন্য আমি সাংবাদিক দেখতেই পারি না।” এসব কথার মাঝে মাঝে সাংবাদিক সমাজ ও নিজ বাহিনীর সদস্যদের নিয়েও নোংরা ভাষায় গালিগালাজ করতে শোনা যায় এ পুলিশ কর্মকর্তাকে। তিনি নিজেকে বিএনপির লোক বলেও দাবি করেন। পুলিশ কর্মকর্তার এ ধরনের বক্তব্য ও আচরণকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সচেতন মহল। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার মুখে এমন অশালীন ভাষা এবং ঘুষ সংক্রান্ত বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে সাংবাদিকের সাথে সরাসরি কথোপকথনের অডিওটির সত্যতা যাচাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি উঠেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন বক্তব্য শুধু পেশাগত নৈতিকতার পরিপন্থী নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ বিষয়ে ওসি (তদন্ত) আব্দুস সালামের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদককে বাকেরগঞ্জ থানায় যাওয়ার অনুরোধ জানান। এ সময় বরিশালের এক সিনিয়র সাংবাদিকের কাছ থেকে তার বিষয়ে জানতে বলেন প্রতিবেদককে। সাংবাদিক আহমেদ বায়েজিদ বলেন, গত ১২ এপ্রিল দুপুরে একটি মামলার বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সবিটা রানির সঙ্গে কথা বলতে গেলে প্রথমে তার কক্ষে বসে আলোচনা হয়। পরে তিনি নিজেই থানার ওসি (তদন্ত) আব্দুস সালামের কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে নিজের পরিচয় দেওয়ার পরই তিনি সাংবাদিকদের নিয়ে আপত্তিকর ও অশালীন মন্তব্য করতে শুরু করেন। তিনি বলেন, “আমি মামলার বিষয়ে তথ্য নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং গোটা সাংবাদিক সমাজকে উদ্দেশ্য করে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় কথা বলতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি দাবি করেন, চাকরি জীবনে তার যত ক্ষতি হয়েছে তার জন্য সাংবাদিকরাই দায়ী।” সাংবাদিক আহমেদ বায়েজিদ আরও বলেন, “কথোপকথনের সময় তিনি নিজেই বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দেন, যেখানে সাংবাদিকদের মাধ্যমে টাকা দাবি, ভিডিও ভাইরাল এবং প্রমোশন সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের বিষয় উল্লেখ করেন। এসব বক্তব্য তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে দিয়েছেন, কোনো প্ররোচনা ছাড়াই।” এ সময় এক সার্কেল এসপিকে নিজের প্রমোশনের জন্য ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন এবং সাংবাদিক ও পুলিশ সম্পর্কে অশালীন ভাষায় মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন,“পুরো কথোপকথনটি আমার কাছে অডিও ও ভিডিও আকারে সংরক্ষিত রয়েছে। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার এমন বক্তব্য জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় বিষয়টি প্রকাশ করা প্রয়োজন মনে করেছি।” তিনি অভিযোগ করেন, “এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে থানায় এসে কথা বলার অনুরোধ জানান।
Leave a Reply