
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কার্যালয়ের উপজেলা প্রকৌশলী কাজী এমামুল হক আলিমের বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্র, ভুক্তভোগী, ঠিকাদার ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের নানা দিক উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার চাঁদপাশা, কেদারপুর, রহমতপুর, আগরপুর, দেহেরগতি ও মাধবপাশা ইউনিয়নে বাস্তবায়িত বিভিন্ন সড়ক, কালভার্ট, ড্রেনেজ ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। অনেক প্রকল্পে অনুমোদিত নকশা ও মানদণ্ড উপেক্ষা করে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এছাড়া কাজ সম্পূর্ণ শেষ না করেই প্রকল্প শেষ দেখিয়ে বিল উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নিম্নমানের কাজের কারণে নির্মাণ শেষ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই সড়কে ফাটল দেখা দিচ্ছে, কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন কালভার্ট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে একদিকে জনসাধারণের দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, প্রকল্পের বিল ছাড় করাতে ৫ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে বাধ্য করা হয়। কমিশন না দিলে বিল আটকে রাখা, ফাইল ঝুলিয়ে রাখা, অযথা জটিলতা তৈরি করা এবং কাজের অনুমোদন বিলম্বিত করার অভিযোগও রয়েছে। ঠিকাদারদের দাবি, এই কমিশন সংস্কৃতির কারণে অনেকেই অতিরিক্ত খরচ সামাল দিতে গিয়ে কাজের মান কমিয়ে দিতে বাধ্য হন।
এছাড়াও অভিযোগ উঠেছে, অধিকাংশ উন্নয়ন প্রকল্প একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এর মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা টেন্ডার প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রকৃত যোগ্য ঠিকাদাররা বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, প্রকল্প অনুমোদন, কাজ বণ্টন এবং বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেকের মতে, এসব অনিয়ম অত্যন্ত কৌশলে পরিচালিত হওয়ায় তা সহজে দৃশ্যমান না হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি উন্নয়ন কাজের গুণগত মানে পড়ছে।
এছাড়া ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন, প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি এবং সরকারি দাপ্তরিক বিধি উপেক্ষার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের ফলে জনগণ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রত্যাশিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
অন্যদিকে স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করায় উপজেলা প্রকৌশলী কাজী এমামুল হক আলিম দপ্তরে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। অতীতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি বিভিন্ন সুবিধা পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সেই প্রভাব এখনো প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিদ্যমান বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সচেতন মহলের দাবি, তার নামে ও বেনামে থাকা সম্ভাব্য সম্পদ, ব্যাংক হিসাব এবং আয়ের উৎস স্বাধীনভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তারা।
এদিকে এসব অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা প্রকৌশলী কাজী এমামুল হক আলিম নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ধামাচাপা দিতে বিভিন্ন মহলে তৎপরতা চালাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সংবাদ প্রকাশের পরপরই তিনি দপ্তরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করেন।
এছাড়া একটি স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করারও চেষ্টা করছেন তিনি। ওই প্রতিবাদলিপিতে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করা হলেও স্থানীয়দের দাবি, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তব চিত্র এবং কাজের নিম্নমানই অনিয়মের প্রমাণ বহন করছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রতিবাদ প্রকাশ করে মূল অভিযোগ থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু প্রতিবাদলিপি দিয়ে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। তারা বলছেন, যেহেতু অভিযোগগুলো সরকারি অর্থ, উন্নয়ন প্রকল্প এবং জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা জরুরি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর কাজের মান, ব্যয় এবং বিল পরিশোধ প্রক্রিয়া তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী কাজী এমামুল হক আলিমের সরকারি মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব দেননি।
Leave a Reply