
নিজস্ব প্রতিবেদক // পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় ঈদ উপলক্ষে আয়োজিত একটি মেলা এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। লেবুখালী পায়রা সেতুর নিচে পুরোনো ফেরিঘাট এলাকায় বসা ‘ঈদ আনন্দ মেলা’ ঘিরে উঠেছে অবৈধ লটারি বাণিজ্যের অভিযোগ। শুরুতে বিনোদনমূলক আয়োজন থাকলেও বর্তমানে মেলার মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে লটারির টিকিট বিক্রি, যা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়াচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১৯ মার্চ মেলার উদ্বোধনের পর প্রথমদিকে পরিবেশ স্বাভাবিক থাকলেও ঈদুল ফিতরের পরদিন থেকে লটারির কার্যক্রম দৃশ্যমানভাবে বিস্তৃত হয়। এখন শুধু মেলা প্রাঙ্গণেই নয়, উপজেলার বিভিন্ন বাজার, গ্রাম ও পাড়া-মহল্লায়ও ছড়িয়ে পড়েছে টিকিট বিক্রি।মেলায় ঢুকতেই চোখে পড়ে আকর্ষণীয় পুরস্কারের সারি-মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, টেলিভিশন, বাইসাইকেলসহ নানা পণ্য। এসব পুরস্কারের প্রলোভন দেখিয়ে দর্শনার্থীদের টিকিট কিনতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বিকেলের পর থেকে মেলার নির্দিষ্ট অংশে ভিড় বাড়তে থাকে, যেখানে প্রকাশ্যেই চলছে টিকিট বিক্রি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্দিষ্ট কিছু বিক্রয়কর্মী এলাকাভিত্তিকভাবে প্রতিদিন টিকিট বিক্রি করছেন। মাইকিং, মৌখিক প্রচারণা এবং নানা কৌশলে মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে।
এতে নিম্নআয়ের মানুষ, দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক, কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মেলায় ঘুরতে আসা দর্শনার্থী জহিরুল ইসলাম বলেন, “আমি প্রতিদিন ৬/৭টা করে লটারি কিনি, কিন্তু কিছুই পাই না। লটারি বিক্রেতারা লোভনীয় পুরস্কারের কথা বলে মানুষকে টানছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই ঠকছে।”
নির্মাণ শ্রমিক আসিফ শেখ বলেন, “লটারির নেশায় প্রতিদিন যা আয় করি, তার অনেকটাই টিকিট কিনে শেষ হয়ে যায়। প্রতিদিনই ভাবি এবার হয়তো কিছু একটা পাব, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই মেলে না।”
লটারির ড্র প্রক্রিয়া ও পুরস্কার বিতরণের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ টিকিট বিক্রি হলেও কে পুরস্কার পাচ্ছেন, কীভাবে ড্র হচ্ছে-এসব বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও হতাশা বাড়ছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, প্রভাবশালী একটি মহলের সহায়তায় এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রশাসনের একটি অংশকে ‘ম্যানেজ’ করেই এমন আয়োজন চলছে-এমন আলোচনা এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শর্তসাপেক্ষে মেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। দুমকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. ফরিদা সুলতানা বলেন, শর্তসাপেক্ষে মেলা পরিচালনার জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শর্ত ভঙ্গ করে আইন অমান্য করার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের কিছু হয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরে যোগাযোগ করা হলে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তারেক হাওলাদার বলেন, “আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। আমরা বিষয়টি অবগত হয়েছি এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুমকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করেছি।”
এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মাহাফুজুর রহমান বলেন, পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের লটারি বাণিজ্য শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, সামাজিক অস্থিরতারও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। দ্রুত লাভের আশায় মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঝুঁকছে, যা ভবিষ্যতে অপরাধ প্রবণতা বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করছে।
স্থানীয়দের দাবি, মেলার নামে কোনো অবৈধ লটারি বা জুয়ার কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকলে তা দ্রুত তদন্ত করে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে অনুমতির আড়ালে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড যেন না চলে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারির আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সম্পাদক : মোঃ রাকিবুল হাছন(ফয়সাল রাকিব)
Copyright © 2024 dailysattyasangbad.com . All rights reserved.